1. NewsDesk@gmail.com : News Desk : News Desk
  2. admin@nayaalo.com : Palash3700 :
  3. rakib@gmail.com : Admin : Rakib Musabbir
  4. bhairabkantho@gmail.com : saimur : rj saimur

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষক, ইমেরিটাস অধ্যাপক ডঃ আনিসুজ্জামান মারা গেছেন

  • আপডেট বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২০

মুঃ মুস্তাকিম হুসাইন, বিশেষ প্রতিনিধিঃ

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষক, ইমেরিটাস অধ্যাপক ডঃ আনিসুজ্জামান না ফেরার দেশে চলে গেলেন। আজ বৃহস্পতিবার বিকেল ৪ টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ( সিএমএইচ) চিরবিদায় নিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন তার ছেলে আনন্দ জামান।

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। অধ্যাপক ডঃ আনিসুজ্জামান হৃদরোগ, কিডনি ও ফুসফুসজনিত সমস্যা, পারকিনসন্স ডিজিজ এবং প্রোস্টেটের সমস্যা ভুগছিলেন।

শারিরীক সমস্যা বাড়তে থাকায় গত ২৭ই এপ্রিল অধ্যাপক ডঃ আনিসুজ্জামান স্যারকে রাজধানী ঢাকার মহাখালীতে অবস্থিত ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসায় অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় স্যারকে ৯ই মে সেখান থেকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের ( সিএমএইচ) আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছিল। আজীবন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক ডঃ আনিসুজ্জামান স্যারের মরদেহ আপাতত সিএমএইচের হিমঘরে রাখা হয়েছে। তারপর দাফন কখন, কোথায়, কিভাবে হবে সে বিষয়ে পারিবার এবং বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে এখনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। অধ্যাপক ডঃ আনিসুজ্জামান ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার শাসনাধীন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাটে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম এ টি এম মোয়াজ্জেম হোসেন ও মাতার নাম সৈয়দা খাতুন। তার বাবা এ টি এম মোয়াজ্জেম হোসেন ছিলেন সেই সময়কার অত্র এলাকার প্রখ্যাত হোমিও ডাক্তার। তার মা সৈয়দা খাতুন গৃহিনী হলেও টুকিটাকি লেখালেখিও করতেন। অধ্যাপক ডঃ আনিসুজ্জামান স্যারের দাদার নাম শেখ আবদুর রহিম, তিনি লেখালেখী করতেন এবং সাংবাদিকতাও করতেন। এ টি এম মোয়াজ্জেম হোসেন ও সৈয়দা খাতুন দম্পত্তির পরিবারের ৫ সন্তানের মধ্যে ডঃ আনিসুজ্জামান স্যার ছিলেন চতুর্থ নম্বরে। তার উপরে পরপর ৩ জন বোন তারপর ডঃ আনিসুজ্জামান এবং ছোট ১ জন ভাই।

অধ্যাপক ডঃ আনিসুজ্জামান তার নিজ গ্রামের স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়ে সেখান থেকে কলকাতার পার্ক সার্কাস হাইস্কুলে ভর্তি হন । পার্ক সার্কাস হাইস্কুলে ৩য় শ্রেণি থেকে ৭ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সময় তারা সপরিবারে পুর্ব পাকিস্তানের ( বর্তমানে বাংলাদেশে) খুলনা মহকুমায় চলে আসেন এবং খুলনা জেলা স্কুলে ৮ম শ্রেণীতে ভর্তি হন। এক বছর পর ৯ম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলে আবার পরিবারের সাথে ঢাকায় চলে আসেন এবং তৎকালীন ঢাকার প্রিয়নাথ হাইস্কুলে (বর্তমান নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়) ৯ম শ্রেণিতে ভর্তি হন। প্রিয়নাথ হাইস্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে ১৯৫১ সালে মেট্রিক পাস করেন। মেট্রিক পাস করার পরে একই বছরে জগন্নাথ কলেজে ( বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) ইন্টারমিডিয়েটে ( আইএ) ভর্তি হন। এখান থেকে ১৯৫৩ সালে তিনি ইন্টারমিডিয়েট ( আইএ) পাস করেন। আইএ পাস করার পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ( সম্মান) পাস করেন এবং ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। সে সময় বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী তার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন।

এর পরের বছর অর্থাৎ ১৯৫৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা একাডেমির বাংলা ভাষা ও সাহিত্য গবেষণা বৃত্তি লাভ করেন। একই বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ” ১৭৫৭ – ১৯১৮ সময়ে ইংরেজ আমলের বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের চিন্তাধারা” বিষয়ে পিএইচডি গবেষণা শুরু করেন। পিএইচডি গবেষণা চলাকালে ১৯৫৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। একই সময়ে তিনি পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের গবেষণা বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৬১ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহন করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে “উনিশ শতকের বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাস: ইয়ং বেঙ্গল ও সমকাল ” বিষয়ে পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি লাভ করেন।

অধ্যাপক ডঃ আনিসুজ্জামান ১৯৬৯ সালের জুন মাসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের রিডার হিসেবে যোগদান করেন। অধ্যাপনাকালে ১৯৭১ সালের মার্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করেন এবং পরবর্তীকালে ভারতের কোলকাতায় চলে যান এবং শরণার্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’র সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে যোগ দেন। তারপর ১৯৭৪ – ৭৫ সালে কমনওয়েলথ অ্যাকাডেমি স্টাফ ফেলো হিসেবে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে গবেষণা করেন। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রকল্পে অংশ নেন।

১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। তারপর একই বছরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। ২০০৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট কর্তৃক অনুমোদিত হয়ে সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে আবার যোগদান করেন। তিনি মওলানা আবুল কালাম আজাদ ইনস্টিটিউট অফ এশিয়ান স্টাডিজ (কলকাতা), প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় এবং নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং ফেলো হিসেবেও কাজ করেছেন । এছাড়াও তিনি নজরুল ইনস্টিটিউট ও সর্বশেষ বাংলা একাডেমির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

অধ্যাপক ডঃ আনিসুজ্জামান স্যারের সম্পাদনায় শিল্পকলাবিষয়ক পত্রিকা ‘ত্রৈমাসিক যামিনী’ এবং বাংলা মাসিক সাহিত্যপত্র ‘কালি ও কলম’- প্রকাশিত হতো। অধ্যাপক ডঃ আনিসুজ্জামান বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে যে অবদান রেখেছেন তা অতুলনীয় যা তাকে অমরত্ব করে রাখবে। তার রচিত গ্রন্থাবলীর তালিকাঃ

মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য (১৯৬৪)
মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্র (১৯৬৯)
মুনীর চৌধুরী (১৯৭৫)
স্বরূপের সন্ধানে (১৯৭৬)
Social Aspects of Endogenous Intellectual Creativity (1979)
Factory Correspondence and other Bengali Documents in the India Official Library and Records (1981)
আঠারো শতকের বাংলা চিঠি (১৯৮৩)
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৯৮৩)

পুরোনো বাংলা গদ্য (১৯৮৪)
মোতাহার হোসেন চৌধুরী (১৯৮৮)
Creativity, Reality and Identity (1993)
Cultural Pluralism (1993)
Identity, Religion and Recent History (1995)
আমার একাত্তর (১৯৯৭)

মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপর (১৯৯৮)
আমার চোখে (১৯৯৯)
বাঙালি নারী সম্পাদনা
সাহিত্যে ও সমাজে (২০০০)
পূর্বগামী (২০০১)
কাল নিরবধি (২০০৩)
বিদেশি সাহিত্য অনুবাদ সম্পাদনা
অস্কার ওয়াইল্ডের An Ideal Husband এর বাংলা নাট্যরূপ ‘আদর্শ স্বামী’ (১৯৮২)
আলেক্সেই আরবুঝুভের An Old World Comedy -র বাংলা নাট্যরূপ ‘পুরনো পালা’ (১৯৮৮)
গ্রন্থ একক ও যৌথ সম্পাদনা সম্পাদনা
রবীন্দ্রনাথ (১৯৬৮)
বিদ্যাসাগর-রচনা সংগ্রহ (যৌথ, ১৯৬৮)
Culture and Thought (যৌথ, ১৯৮৩)
মুনীর চৌধুরী রচনাবলী ১-৪ খণ্ড (১৯৮২-১৯৮৬)
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, প্রথম খণ্ড (যৌথ, ১৯৮৭)
অজিত গুহ স্মারকগ্রন্থ (১৯৯০)
স্মৃতিপটে সিরাজুদ্দীন হোসেন (১৯৯২)
শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মারকগ্রন্থ (১৯৯৩)
নজরুল রচনাবলী ১-৪ খণ্ড (যৌথ, ১৯৯৩)
SAARC : A People’s Perspective (১৯৯৩)
শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের আত্মকথা (১৯৯৫)
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ রচনাবলী (১ ও ৩ খণ্ড, ১৯৯৪-১৯৯৫)
নারীর কথা (যৌথ, ১৯৯৪)
ফতোয়া (যৌথ, ১৯৯৭)
মধুদা (যৌথ, ১৯৯৭)
আবু হেনা মোস্তফা কামাল রচনাবলী (১ম খণ্ড, যৌথ ২০০১)
ওগুস্তে ওসাঁর বাংলা-ফরাসি শব্দসংগ্রহ (যৌথ ২০০৩)
আইন-শব্দকোষ (যৌথ, ২০০৬)

অধ্যাপক ডঃ আনিসুজ্জামান অর্জিত পুরস্কারঃ- ১৯৫৬: নীলকান্ত সরকার স্বর্ণপদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৯৬৫: দাউদ পুরস্কার
১৯৭০: প্রবন্ধ-গবেষণায় অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি থেকে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার
১৯৮৫: শিক্ষায় অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক
১৯৯৩: আনন্দবাজার পত্রিকা কর্তৃক প্রদত্ত আনন্দ পুরস্কার
২০০৫: রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডি. লিট. ডিগ্রি
এশিয়াটিক সোসাইটিতে (কলকাতা) ইন্দিরাগান্ধী স্মারক বক্তৃতা
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে শরত্‍চন্দ্র স্মারক বক্তৃতা
নেতাজী ইনস্টিটিউট অফ এশিয়ান অ্যাফেয়ার্সে নেতাজী স্মারক বক্তৃতা
অণুষ্টুপের উদ্যোগে সমর সেন স্মারক বক্তৃতা প্রদান।
২০১৪: শিক্ষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য ভারত সরকার প্রদত্ত তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার পদ্মভূষণ পদক
২০১৫: সাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কার
২০১৭: বিপুলা পৃথিবী বইয়ের জন্য আনন্দবাজার পত্রিকা কর্তৃক প্রদত্ত আনন্দ পুরস্কার
২০১৮: বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগত্তারিণী পদক
২০১৯: সার্ক কালচারাল সেন্টার থেকে সার্ক সাহিত্য পুরস্কার
২০১৯: শিক্ষাক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ স্বর্ণপদক।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অনন্য সারথী অধ্যাপক ডঃ আনিসুজ্জামান ২০২০ সালের ১৪ মে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ৮৩ বছর বয়সে জীবনাবসান ঘটে । সর্বশেষ তার মৃতদেহ থেকে নমুনা নিয়ে করোনা পরীক্ষা করা হলে জানা যায় তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ
© All rights reserved Nayaalo.com 2020
Site Customized By NewsTech.Com